History :: প্রতিষ্ঠার কথা

  • হযরত শাহ মখদুম রুপোস (র:) এর স্মৃতি বিজড়িত পদ্মাপ্রবাহচুম্বিত, রেশমখ্যাত, শিক্ষানগরী রাজশাহীর চিকিৎসা সুবিধা সমৃদ্ধ এলাকা কাজিহাটা লক্ষ্মীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল প্রায় অর্ধশতাব্দির দ্বারপ্রান্তে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে এ কলেজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ড. মোঃ শামসুদ্দিন মিয়া নিয়োগপ্রাপ্ত হন ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে। এ অঞ্চলের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে নির্মিত এ কলেজের প্রতিষ্ঠাকালে নাম ছিল ‘রাজশাহী সরকারী ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’। প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোঃ শামসুদ্দিন মিয়া এ কলেজে নিয়োগপ্রাপ্তির সময় রাজশাহী কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর এম.এ.হাই।   বাস্তবতার নিরিখেই রাজশাহী ইন্টারমিডিয়েট কলেজের নবনির্মিত ভবনের সঙ্গে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের এক যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজস্ব কোন ভবন না থাকায় ইন্টারমিডিয়েট কলেজের জন্য নির্মিত ভবনে বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। এ সময় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট থেকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের জুন পর্যন্ত কলেজের মূলভবনের তিনটি ব্লকের মধ্যে কোনটিই কলেজের জন্য ছাড়েন নাই। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে কলেজ ভবনের উত্তর ব্লকের দোতলা অংশ ছেড়ে দিলে নিজস্ব ভবনে শুরু হয় কলেজের আনুষ্ঠানিক পদচারণা। নবনির্মিত এ কলেজের জন্য মোট ১৬টি প্রভাষক পদ সৃষ্টি হয়, যাঁরা রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষের নিয়ন্ত্রণে থেকে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে সংযুক্ত ছিলেন। যদিও সে সময়ে নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ রাজশাহী কলেজের প্রশাসনিক কার্যালয়ে বসেই নতুন কলেজের দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করতেন। এ সময় ডি.পি.আই (তৎকালীন সময়ে কলেজ তদারকীর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা) ছিলেন জনাব ফেরদৌস খান এবং শিক্ষা সচিব ছিলেন জনাব বোরহান উদ্দীন।

    রাজশাহী কলেজে ভর্তিকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু অংশ স্থানান্তরের মাধ্যমে এ কলেজে প্রথম ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রথম সেশনে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের জন্য আর্টস ও কমার্সে ২০০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সে সময় কলেজের বর্তমান খেলার মাঠ নিচু থাকায় ডি.আই.জি’র অনুমতি সাপেক্ষে জেলখানার পশ্চিম পাশের মাঠটি ছাত্র-ছাত্রীরা খেলাধুলার জন্য ব্যবহার করতো। লেখাপড়ার পাশাপাশি শারীরিক যোগ্যতা ঠিক রাখার জন্য কলেজ জিমনেশিয়ামও নির্মিত হয় সে সময়েই। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা ও ভূগোলের ল্যাবরেটরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়পূর্বক বিজ্ঞান শাখায় ২৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়। একই সাথে ডিপিআই এর নির্দেশে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে গণিত বিষয়ও খোলা হয়।

    বিজ্ঞান শাখায় কোন শিক্ষক না থাকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর শামছুল হক (সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী) সদয় হয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের জন্য একজন করে লেকচারার পাঠিয়ে তিন মাস পর্যন্ত ক্লাস নিতে সহায়তা করেছেন। এ সময় ছাত্রদের হোস্টেল নির্মাণাধীন থাকায় সাময়িকভাবে কলেজ ভবনের নিচতলা ছাত্রদের আবাসিকতার জন্য ব্যবহার করা হতো। নির্মাণ কাজ শেষ হলে ছাত্ররা হোস্টেলে (বর্তমানের শামসুদ্দিন ছাত্রাবাস) স্থানান্তরিত হয়। কলেজের ভৌত অবকাঠামো সন্তোষজনক থাকায় ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান হেনা-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ডিগ্রী কোর্স খোলা হলে কলেজটি রাজশাহী নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজ নামে পরিচিতি লাভ করে।  পণ্ডিত, শিক্ষানুরাগী, প্রজ্ঞাবান অধ্যক্ষের স্মৃতিকে ধারণ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখার জন্য কলেজের প্রথম ছাত্রাবাসটিকে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোঃ শামসুদ্দিন মিয়া’র নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ কলেজের দ্বিতীয় অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ হায়দার হোসেনও পূর্বসূরীর কর্মনীতিকে অনুসরণ করেছেন এবং কলেজের মান উন্নয়নে অনলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কলেজের দ্বিতীয় ছাত্রাবাসকে ‘হায়দার হোসেন হোস্টেল’ হিসেবে নামকরণ তাঁর প্রতি কলেজ সংশ্লিষ্ট সকলের শ্রদ্ধার স্মারক।

    তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী কলেজে স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রম প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৯৭-১৯৯৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি বন্ধ করা হলে (২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনপ্রবর্তন করা হয়েছে) নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজই হয়ে উঠে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির জন্য উত্তরবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বিজ্ঞান শাখায় চারটি সেকশনে মোট ৬০০ জন, মানবিক শাখায় দুটি সেকশনে মোট ৩০০ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় দুটি সেকশনে মোট ৩০০ জন ছাত্র-ছাত্রী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। উচ্চ শিক্ষার সুযোগ প্রসারের লক্ষে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বিষয়ে এবং ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইংরেজি, অর্থনীতি, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনাসহ মোট ৭টি বিষয়ে অনার্স কোর্স প্রবর্তিত হয়। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে অনার্স কোর্সের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভূগোল ও পরিবেশ এবং ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স কোর্স প্রবর্তিত হয়। এ নিয়ে বর্তমানে মোট ১৫টি বিষয়ে ১০৬৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ১ম বর্ষ অনার্স কোর্সে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।

    এক সময়ের ক্ষুদ্র পরিসরে গড়ে উঠা ‘রাজশাহী সরকারী ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’ বর্তমানের নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজ, রাজশাহী কালের পরিক্রমায় এখন এক মহীরূহ। প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় কলেজ চত্বর সবসময় থাকে সরব। বর্তমানে এ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ১৭টি বিষয়ে, স্নাতক পাস এবং অনার্স পর্যায়ে ১৫টি করে বিষয়ে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে এবং ৭০ টি সৃষ্ট পদে শিক্ষকগণ কর্মরত থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এছাড়াও ছাত্রদের জন্য দুটি ও ছাত্রীদের জন্য একটি হোস্টেল রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ফলাফল বিবেচনায় সরকারি কলেজসমূহের মধ্যে দেশের শ্রেষ্ঠ কলেজ সমূহের মধ্যে এ কলেজ অন্যতম। শিক্ষক স্বল্পতা, ভৌত অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা, আবাসিক সমস্যার মতো বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষকগণ এ কলেজের মান সমুন্নত রাখতে নিরলসভাবে এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
    তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ফরিদা সুলতানা ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজ ড্রেস প্রবর্তন করেন। কলেজ গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর  অবদান অনস্বীকার্য। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভৌত অবকাঠামোর কোন উন্নয়ন না হলেও দীর্ঘ সময় পর ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে একাডেমিক ভবন-২ এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০১১-২০১২ অর্থবছরে তা দোতলা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে একাডেমিক ভবন-২ ৪র্থ তলায় উন্নীত হয়। ছাত্রীনিবাসে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের সীমানা প্রাচীরের অভ্যন্তরভাগ দিয়ে কলেজে আসার কোন রাস্তা ছিল না। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ছাত্রীনিবাস থেকে কলেজ পর্যন্ত কংক্রিটের রাস্তাটি নির্মিত হয়।

    বর্তমান অধ্যক্ষ এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র প্রফেসর এস. এম. জার্জিস কাদির কলেজে যোগদানের পর থেকেই ছাত্রত্বের বোধ ও আত্মচেতনা থেকে কলেজের বর্তমান অবকাঠামোরই সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সুবিধা বৃদ্ধিসহ শিক্ষার মান কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য বহুবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন। কলেজের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, শ্রেণিকক্ষ, মূলভবন, প্রধান ফটক, সীমানা প্রাচীর ও কলেজ বাগানের প্রয়োজনীয় সংস্কার ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছেন। অধ্যক্ষের বাসভবন সংস্কার করে মানসম্পন্ন পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়াও কলেজ অডিটোরিয়ামের আধুনিকায়ন, ছাত্রীনিবাস সুসজ্জিতকরণ, অভিভাবকদের জন্য মানসম্মত রিসিপশন কক্ষ নির্মাণসহ সকল ছাত্রাবাসের প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করা হয়েছে। রাজশাহীর চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় অধ্যক্ষ এবং শিক্ষকগণ তাঁদের কার্যালয় ও মিলনায়তনে অবস্থান করে স্বস্তির সঙ্গে কাজ করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে একটি সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু ভাল ফলাফলই নয় একজন শিক্ষার্থীকে দেশপ্রেমিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের প্রত্যয় থেকে খেলাধুলা, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও জাতীয় সকল দিবসকে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপনের সার্বিক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে গঠিত ছাব্বিশটি বিভিন্ন কমিটি এ লক্ষে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।

    এ কলেজ- সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা এ অঞ্চলের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অহংকারের প্রতীক। আমাদের সকলের অবদানে এ প্রতিষ্ঠান আরও গৌরবমণ্ডিত হবে এবং এর ঐতিহ্যে সংযোজিত হবে নতুন নতুন উপাদান- এটিই সকলের প্রত্যাশা।



themecircle.net
New Govt. Degree College

C & B Mor, Rajshahi.
ngdcrajbd@yahoo.com
www.ngdc-raj.ac.bd

Find us